যুক্তরাষ্ট্রে টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) বা অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদায় বসবাসরত হাজার হাজার অভিবাসী এখন এক কঠিন অনিশ্চয়তার মুখে। সম্প্রতি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের একটি বিভক্ত রায়ের পর দেশটির হোমল্যান্ড সিকিউরিটিবিষয়ক মন্ত্রী মার্কওয়েন মোলেন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, এসব অভিবাসীর হয় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার চেষ্টা করা উচিত, নয়তো নিজ নিজ দেশে ফিরে যাওয়া উচিত। এই মন্তব্যের ফলে হাইতি, সিরিয়া, আফগানিস্তান ও ক্যামেরুনসহ বিভিন্ন দেশের অভিবাসী সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
গত রোববার সিএনএনের ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী মোলেন বলেন, “হয় স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি পেতে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার চেষ্টা করুন এবং বৈধ স্থায়ী মর্যাদায় এখানে থাকুন, নয়তো আমরা আপনাকে নিজ দেশে ফিরে যেতে সহায়তা করব।” তিনি আরও জানান, যারা স্বেচ্ছায় নিজ দেশে ফিরতে রাজি হবেন, তাদের জন্য সরকার উড়োজাহাজের টিকিট এবং নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য প্রায় ২ হাজার ১০০ ডলার আর্থিক সহায়তা দেবে। মোলেনের মতে, আদালতের ব্যাখ্যা এবং এই কর্মসূচির নাম থেকেই স্পষ্ট, টেম্পোরারি প্রোটেক্টেড স্ট্যাটাস (টিপিএস) কোনো স্থায়ী মর্যাদা নয়।
এই মন্তব্যের প্রেক্ষাপট হলো গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়। এই রায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে হাইতি ও সিরিয়ার শত শত অভিবাসীর মানবিক সুরক্ষার মর্যাদা বাতিল করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই মর্যাদা এত দিন তাদের সংঘাত ও চরম দারিদ্র্যে জর্জরিত নিজ দেশে ফেরত পাঠানো (নির্বাসন) থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছিল। সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তকে অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের আরও একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে, যদিও এই রায় এসেছে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি শেষ হওয়ার পর।
টিপিএস হলো যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনের অধীনে একটি বিশেষ মর্যাদা, যা দেশটির প্রশাসনকে যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্যান্য প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের যুক্তরাষ্ট্রে অস্থায়ী হিসেবে বৈধভাবে বসবাস ও কাজ করার অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা দেয়। ২০১০ সালে ভয়াবহ ভূমিকম্পের পর যুক্তরাষ্ট্র প্রথম হাইতির নাগরিকদের জন্য এই সুবিধা দেয় এবং সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ২০১২ সালে সিরীয়দের জন্যও এই সুবিধা চালু করা হয়। অতীতে এই মর্যাদা বারবার পুনর্নবায়ন করা হলেও, এখন তা বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের এই সম্ভাব্য নির্বাসন পরিকল্পনার বিরুদ্ধে নিজ দলের ভেতর থেকেই তীব্র বিরোধিতা আসছে। ওহাইওর গভর্নর মাইক ডিওয়াইন গত রোববার সিএনএনকে দেওয়া এক বক্তব্যে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, হাইতিয়ানদের ফিরে যাওয়া নিরাপদ নয়। তিনি আরও যুক্তি দেন যে, পরিশ্রমী কর্মীদের অপসারণ ওহাইওর অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর হবে এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে জনবল সংকট তৈরি করবে। ডিওয়াইন উল্লেখ করেন, “অনেক ক্ষেত্রে হাইতিয়ানরাই আপনার মা বা বাবার দেখাশোনা করছেন, যাঁদের আলঝেইমার হয়েছে। তাঁরা এমন পরিবারের সদস্যদেরও যত্ন নিচ্ছেন, যাঁরা নার্সিং হোমে থাকেন। এখন যদি আমরা তাঁদের সবাইকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলি, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এটা সম্ভব হবে না।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারের সময় ট্রাম্প ওহাইওতে বসবাসরত হাইতিয়ানদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলেছিলেন। অথচ রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওহাইও অঙ্গরাজ্যের কিছু এলাকায় শিল্প-পরবর্তী পতনের লক্ষণ দেখা দিলেও, অভিবাসী হাইতিয়ানরা সেখানে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবনে সহায়তা করেছেন, যার ফলে মজুরি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে, এসব সুরক্ষা বাতিলের পদক্ষেপ নেওয়া হলেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বর্তমানে হাইতি বা সিরিয়ায় ভ্রমণের বিরুদ্ধে সতর্কতা জারি করেছে। সংস্থাটি উল্লেখ করেছে যে, এই দুই দেশে ব্যাপক সহিংসতা, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং অপহরণের ঘটনা ঘটছে, যা টিপিএস বাতিল এবং অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। আফগানিস্তান ও ক্যামেরুনসহ হাজার হাজার অভিবাসীর বিতাড়ন থেকে সুরক্ষা হারানোর সম্ভাবনার মধ্যে এই সিদ্ধান্তগুলো যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে অভিবাসী সম্প্রদায়ের ভবিষ্যৎকে গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
শেষ বার্তা সময়ের শেষ বার্তা
