Thursday , April 25 2024
Breaking News

তালেবান ফিরে আসার নেপথ্যে

আর্ন্তজাতিক বার্তা ডেস্ক : আফগানিস্তানকে তালেবানের হাত থেকে রক্ষার নামে মার্কিন তথা ন্যাটো বাহিনী আফগানিস্তানে প্রবেশ করেছিল দীর্ঘ ২০ বছর সেই তালেবানের হাতেই আফগানিস্তানকে তুলে দিয়ে ফিরে আসে আমেরিকা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ঘোষণা দিয়ে গত বছরের ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব সৈন্য দেশে ফিরিয়ে নেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে সেনা প্রত্যাহারের পর মাত্র ৭ হাজার মার্কিন সৈন্যকে আফগানিস্তানে রাখা হয়। আফান বিমানবন্দরে থাকা যুদ্ধ বিমান, যুদ্ধে ব্যবহৃত গোলাবারুদ ও সরঞ্জামাদি নিস্ক্রিয় করার পর ফিরিয়ে আনা হয় ওই সব ন্যাটো সেনাদের। আফগানিস্তান থেকে ন্যাটো তথা মার্কিন বাহিনী নিরাপদে ফিরে আসলেও আফগানদের জন্য রেখে আসে শুধু দুর্দশা।

সৈন্য প্রত্যাহারের জন্য ১১ সেপ্টেম্বর তারিখটি ঠিক করা হয়, যা ছিল খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ২০ বছর আগে ২০০১ সালের ওই দিনে আল কায়েদা আমেরিকায় সন্ত্রাসী হামলা চালায়, যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল আফগানিস্তানে মাটিতেই। নাইন ইলেভেনে বিশ্ব দেখেছিল টুইন টাওয়ার ধ্বংস আর ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়েছিল আমেরিকার চরম ব্যর্থতার ইতিহাস।

আফগানিস্তান থেকে মার্কিন ও ন্যাটো বাহিনীর প্রত্যাহারকে মনে হতে পরে একটি পর্বের সমাপ্তি, একটি সাধারণ পরাজয়ের ঘটনা। তবে বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যদি দেখা হয়, তবে এই পরাজয় মার্কিন বাহিনীর ধারাবাহিক ব্যর্থতার ইতিহাসে নতুন একটি পালক। লেবানন থেকে শুরু করে আরব বসন্ত, ইরাক, সোমালিয়া, সিরিয়াতে মার্কিন বাহিনীর শুরুটা দুঃসাহসিক হলেও, খারাপভাবে ইতি টেনেছে সবখানেই। ওই সব দেশগুলোকে আগের চেয়ে আরও বেশি বিপর্যন্ত ও বিধ্বস্ত অবস্থায় ফেলে চলে এসেছে আমেরিকা।

২০২১ সালের মাঝামাঝি থেকেই আফগানিস্তান চূড়ান্ত বিপর্যয়ের দিকে আগ্রসর হয়। দুর্নীতি, দুর্বল গণতান্ত্রিক কাঠামো, পশ্চিমাদের রাজনৈতিক ভুলের ভারে আফগানিস্তান তার অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো থেকে ক্রমেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল। আফগানিস্তানে আমেরিকা নিজে যেমন চালে ভুল করেছে, তেমনি অন্যদেরও ভুল করতে দিয়েছে। গত বিশ বছরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং ইউরোপিয়ান নেতারা অনেকবারই আফগানিস্তান থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিলেও আফগানিস্তানের জনগণ, তালেবান নেতা ও তাদের সমর্থকরা ধরেই নিয়েছিল ন্যাটো বাহিনীকে সরিয়ে নেওয়ার কাজটা তারা করতে সক্ষম হবে না।

আফগানিস্তান থেকে বিদেশি সেনা সরিয়ে নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণা বিস্ফোরকের মতো কাজ করেছিল। শুরু থেকেই দোহা চুক্তি নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়। বিশ বছরে আফগান জনগণ এবং দেশটির কর্তৃপক্ষ ন্যাটো নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল। হঠাৎ সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেশটিকে অস্থিতিশীল করে দেয়। মুহূর্তেই তালেবানের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। ফলে আফগান নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা আর সম্ভব হয় না।

যদিও চুক্তিটিকে শান্তি চুক্তি বলা হয়, তবে সেটি ছিল আফগানিস্তান থেকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের একটি চুক্তি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চুক্তিটি করার সময় নিজেদের স্বার্থ সংরক্ষণের কৌশলটাই বেছে নেয়। অতি অল্প সময়ে নিরাপদে আফগানিস্তান ছেড়ে আসার পথ বের করতে সমঝোতার মাধ্যমে দোহা চুক্তি সম্পাদন করে। দোহা চুক্তিটি ছিল পুরোপুরি তালেবানের পক্ষে। ফলে চুক্তি হওয়ার পর আফগান সরকার শক্তি হারাতে শুরু করে। মার্কিন ও তার মিত্র বাহিনী নিরাপদে তাদের চাদর গুটিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কিছুই করেনি।

২০০১ সালে তালেবানদের হটাতে আফগানিস্তানে যে অভিযান শুরু হয় সেটি সম্পূর্ণ করতে এবং আফগানিস্তানে শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো দৃঢ় সংকল্প  বা কৌশলগত ধৈর্য দেখতে পায়নি বিশ্ব। দোহা চুক্তিটি তালেবান এবং আফগান জনগণের কাছে পরিষ্কার সেই ইঙ্গিতই দেয়। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেনা প্রত্যাহারের প্রাথমিক ঘোষণা এবং ২০২১ সালের এপ্রিলে নতুন মার্কিন প্রশাসন সেনা প্রত্যাহারের তারিখ নির্ধারণের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ন্যাটোর প্রতি আফগান জনগণের মনোভাব পরিবর্তন হতে থাকে। আফগানরা ন্যাটো ও মার্কিন বাহিনীকে বন্ধুর পরিবর্তে—অবিশ্বস্ত এমনকি বিশ্বাসঘাতক বলে অভিহিত করতে থাকে।

ফলাফল দাঁড়ায় ২০২১ সালের জুলাই নাগাদ তালেবানরা আফগানিস্তানে তাদের আসন পুনরায় ফিরে পেতে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে এবং একের পর এক জেলা আক্রমণ শুরু করে। জুনের ২৫ তারিখের মধ্যে দেশটির ৪১২টি জেলার ৯৯টি তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। জুলাইয়ের ১৪ তারিখের মধ্যে তালেবানদের নিয়ন্ত্রণে আসে ২১৮টি জেলা। এরপর তালেবানরা কয়েক দিন হামলা বন্ধ রাখে এবং রাজধানী কাবুলের আশপাশে অবস্থান নেয়। তালেবানরা এ সময় চুক্তিটি চূড়ান্ত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছিল এবং সেই সঙ্গে তালেবানের কাউন্সিল অর্থাৎ কোয়েটা শূরার সিনিয়র নেতাদের নির্দেশের অপেক্ষা করছিল। তবে আফগান সরকার পালিয়ে যাবে বা কাবুলের এত দ্রুত পতন হবে— এটা মনে হয় পশ্চিমা কর্মকর্তারা তখনো ভাবতে পারেননি।

এদিকে, ১৪ আগস্ট মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একটি সমন্বিত বৈঠক হয়, ওই বৈঠকের একটি স্মারকলিপি পরে ফাঁস হয়ে যায়। যেখানে উল্লেখ ছিল, ওয়াশিংটনের প্রস্তুতির যথেষ্ট অভাব ছিল তাই সেনা প্রত্যাহারের সময় নাটকীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৫ আগস্ট তালেবান বাহিনী রাজধানী কাবুলে প্রবেশ করে। খবর পেয়ে প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আচমকাই উজবেকিস্তানে পালিয়ে যান। প্রেসিডেন্টের পালিয়ে যাওয়ার খবর মুহূর্তেই দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এ খবর শুনে প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের নিরাপত্তা রক্ষী এবং কর্মকর্তা কর্মচারীরা সবকিছু অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে চলে যায়। ওই দিনই তালেবানরা প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ে প্রবেশ করে আফগানের মসনদ দখলে নেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশ্রুত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছে—রাজধানী কাবুলের সুরক্ষার কথা ভেবে সাবেক রাষ্ট্রপতি হামিদ কারজাই ও জাতীয় পুনরেকত্রীকরণ হাই কাউন্সিলের প্রধান আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ ১৬ আগস্ট সন্ধ্যায় আলোচনার মাধ্যমে একমত হয়ে তালেবানকে কাবুলে প্রবেশের আমন্ত্রণ জানান। দেশের জনগণকে রক্ষা ও শহরগুলোকে বিশৃঙ্খল অবস্থা থেকে মুক্ত করার আহ্বান জানান।

গোয়েন্দা তথ্য, সামরিক বাহিনীর অবস্থান, রাজনৈতিক পরিস্থিতি সব কিছুতেই অসঙ্গতি দেখা দেয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জুলাইয়ে আফগান সরকারের সম্ভাব্য পতনের ঘোষণা দেন। সেই সঙ্গে ন্যাটো বাহিনী জানায়, আফগান পরিস্থিতি খুবই নাজুক আর স্বশস্ত্র বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটো বাহিনীর অন্য সদস্য দেশগুলোর কাছে পরিস্থিতির পরিষ্কার চিত্র ফুটে ওঠে। ওয়াশিংটন আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিবর্তে দ্রুত সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে ন্যাটো বাহিনীর অন্যন্য দেশ সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার শর্ত ও তারিখ সংশোধনের দিকে জোর দেয়।

তালেবানদের কাবুল দখল করে নেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছিল সে খবর আফগানিস্তানের বাইরে তেমন একটা যাচ্ছিল না। মার্কিন বাহিনীর অভিযান বা অন্য সব খবর নির্ভর করছিল ওয়াশিংটনের ওপর। আর মার্কিন বাহিনী সেখানে এত বেশি চ্যালেঞ্জের মধ্যে ছিল; বিশেষ করে সৈন্য সরিয়ে নেওয়ার কাজে এত বেশি ব্যস্ত হচ্ছিল যে তারা অন্য কোনো দিকে মনোযোগ দিতে পারেনি। এদিকে, আফগানিস্তান ছাড়ার হিড়িক পড়ে যায়। কাবুল বিমানবন্দরে লোকে লোকারণ্য অবস্থা। তবে সব বিশৃঙ্খলার মূল কারণ ছিল বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় দায়িত্বরতরদের বিমানবন্দর ত্যাগ। আফগানিস্তানের নির্বাচিত সরকারের পতনের খবরের পর বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মী ও বহু কর্মকর্তা কর্মস্থল ত্যাগ করেন। ফলে মার্কিন বাহিনী বিমানবন্দরয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

আফগানিস্তানের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে শরণার্থী শিবিরে রূপান্তর করা হয়। আফগানিস্তান থেকে যে সব বিদেশিদের সরিয়ে নেওয়া হবে তাদের অস্থায়ীভাবে সেখানে রাখা হয়। ১৫ আগস্ট জাতিসংঘ, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক আফগানিস্তান ছাড়েন। কিন্তু এভাবেই কী আফগানিস্তানে মার্কিন হস্তক্ষেপের পরিসমাপ্তি টানার কথা ছিল? অবশ্যই নয়।

এছাড়াও

প্রাণে বাঁচলেন মেহবুবা মুফতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচলেন জম্মু ও কাশ্মিরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *